বানানো সাজানো “আমরা দুজনা স্বর্গ খেলনা” রচনার প্রেমকাহিনি নয় এই গল্পগুলো। ওই রকম আলাদা করে বিজ্ঞাপিত ‘ভালবাসা’ হয় কিনা আমার ঠিক জানা নেই। তবে শুশ্রূষার মতো যে ভালবাসা মানুষকে জীবন আঁকড়ে ধরে বাঁচার উষ্ণতা দেয়, আমাদের চেনা জগতে তা দুর্লভ নয়। হয়তো সেই ভালবাসা সোচ্চার নয় বলে আমরা চিনতে পারি না। গল্পগুলো আমার লেখা হলেও, কথাগুলো ঠিক আমার নয়। কখনও কোনও ক্ষণিকের অতিথি এক হাওয়া জ্যোৎস্নার রাতে নিজের জীবনের কথা বলে গেছেন — ভাঙা গলায়, থেমে থেমে। কখনো কোনো গল্পের নায়িকা হালকা হাসির আড়ালে “জানিস তো, সেই আমাদের বালিকাবেলায়” দিয়ে শুরু করে লুকিয়ে রাখা কষ্ট আমার কানে তুলে দিয়েছেন। কখনও কারখানার শ্রমক্লান্ত মহিলা সাফাই-কর্মী শুনিয়েছেন জীবন ও ভালবাসা নিয়ে প্রগাঢ় দার্শনিক উপলব্ধি। আর বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা নিজের প্রেম-কথা বলে গেছেন প্রায় কথকঠাকুরের মতো অসামান্য লোককথার মোড়কে মুড়ে।
আমি শুধু শুনে গেছি। বয়ে চলে সময়ের বিভিন্ন পর্বে, অবসরে। এঁদের কেউ কেউ লিখতে পারে না বলে লেখেনি। কেউ বা লেখার মতো মনেই করেনি, জীবনের আর পাঁচটা ঘটনার মতো সহজ-স্বাভাবিক ভেবে। কেউ বা আবার নিজের ভালোবাসার গল্প লেখার সাহস পায়নি। তারা হয়তো এই ভেবে আমাকে বিশ্বাস করেছে, যে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় রঙ না চড়িয়ে গল্পকাররা গল্প লিখতে পারবে না। কিন্তু কল্পনার মায়ার আড়ালে আসল গল্পটা তো রয়ে রয়ে যাবে। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প কোনো না কোনো মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়া স্বীকারোক্তি— যেখানে ভালোবাসা ছিল, ভুল ছিল, অপেক্ষা ছিল, ধরে রাখার ইচ্ছা ছিল, অথবা ছেড়ে দেওয়ার উদারতা ছিল, কিংবা কিছুই ছিল না নিরুপায় হয়ে অনুভব করা ছাড়া। আর ছিল না বলা অনেক কথা। এগুলো পড়তে পড়তে মনে হতে পারে— এই গল্পটা যেন বড্ড চেনা। কারণ সত্যি ভালবাসা তো কখনও আলাদা কিছু হয় না, শুধু মানুষ বদলে যায়।
অল্প পরিসরে বইয়ে তেমনই কিছু মানুষের না বলা ভালোবাসার কথা বরং ধরা থাক স্মৃতিসুধায়!